জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে পদব্রজ

জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের পুকুর

প্রথমেই পদব্রজ শব্দটার সাথে একটু পরিচিত হই। বাংলা পদব্রজ শব্দের অর্থ পদযোগে গমন বা পায়ে হেঁটে যাওয়া। আমরা নিয়মিতই কোথাওনা কোথাও হেঁটে যাই। তবে বর্তমান সময়ে পায়ে হেঁটে কোথাও ভ্রমন করা অর্থে বেশি ব্যাবহৃত হয়, অনেকে কোথাও ভ্রমন করতে যাওয়াকেও পদব্রজ শব্দের মাধ্যমে প্রকাশ করে।

যানবাহনের উৎকর্ষে আজকের দিনে হেঁটে দূরে কোথাও যাওয়া অনেকটাই হাস্যকর। ঘর থেকে বের হলেই রিকসা, সাইকেল, মটর-সাইকেল কিংবা মটর-গাড়ি হাজির। আমার আম্মা ডায়াবেটিক, হৃদরোগ এবং আরো নানাবিদ রোগে আক্রান্ত তাই প্রায়শই কম দূরত্বের স্থানে হেঁটেই চলে যায়। গ্রামে এখন প্রায় অধিকাংশই পাকা রাস্তা যদিও দীর্ঘসময় ধরে একই সরকার থাকায় খুব একটা রাস্তার উন্নয়ন হয়না। বলতে পারেন এ কেমন কথা, আসলে এমনটাই হয়। প্রতিবার সংসদীয় নির্বাচনের আগে গ্রামের রাস্তার কাজ ধরা হতো কিন্তু বিগত সালগুলোতে নির্বাচন পূর্বমুহূর্তে এ বিষয়ে খুব একটা উৎসাহ দেখা যায় না। মূল কথায় আসি, আম্মাকে রাস্তায় হাঁটতে দেখে অনেকেই ব্যঙ্গবিদ্রুপের স্বরে বলে “এতো টাকা কই রাখবেন?”।

মানুষের সহজাত প্রবৃদ্ধি থেকে মানুষ স্বাধীন হতে চায়। সেই ছোট থেকেই স্কুল, কলেজ তারপর বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাস, পরিক্ষা, ট্রেনিং লেগেই আছে। মাঝে-মাঝে মনে হয় এই গতবাঁধা জীবন থেকে পালিয়ে জঙ্গলে আশ্রয় নেই কিন্তু ইংরেজি চলচ্চিত্র “ইনটু দ্যা ওয়াইল্ড” দেখার পর-পরই এই চিন্তা পগার পার। এখনকার ভাবনা হচ্ছে সাময়িকের জন্য কোথাও বেড়িয়ে আসা। আর তারই সূত্র ধরে কয়েকদিন ধরে মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে পদব্রজের কথা। সেই চিন্তা থেকেই এই উদ্যোগ।

কিন্তু বিপত্তি বাঁধলো, পায়ে হাঁটার পক্ষে মগজ সায় দেয়না। বাসে চড়ে-চড়ে বাসে চড়াটাই স্বাভাবিক মনে হচ্ছে, হাঁটাটা সম্পূর্নই অস্বাভাবিক। ছুটির দিন ঘুম থেকে এমনিতেই দেরিতে উঠা হয় তার-ওপর বাইরে কড়া রোদের মাঝে বাসা থেকে বের হতেও ভয় করে। অলস এবং আরামপ্রিয় প্রানী বলে কথা। অবশেষে আজ সোমবার ঠিক করলাম বের হবোই হবো।

বিসমিল্লাহ বলে ৫০০মিলি পানি আর ২ প্যাক চিপস কাঁধের ব্যাগে করে বের হয়ে পড়লাম। প্রতিজ্ঞা করলাম অবশ্যই সম্পূর্ন পথে কোন যানবাহন ব্যাবহার করবো না। যথাসম্ভব ফুটপাত এবং রাস্তা পারাবারের সময় ওভার ব্রিজ ব্যবহার করবো। প্রথম পদক্ষেপ মিরপুর ১৩-‘র হারমান মেইনারের সামনের ওভার ব্রিজ পারহওয়া। প্রতিদিন ক্লাস থেকে ফেরার পথে সরাসরি নিচ দিয়েই পার হই যদিও এটা অন্যায় তবুও সবাই একই কাজ করে। সম্ভবত শতকরা ০.২ ভাগ মানুষও এর উপর দিয়ে পার হয়না! মাঝে-মাঝে এর উপর কপোত-কপোতি কিংবা কয়েকজন বন্ধু মিলে আড্ডা দিতে দেখা যায়। বাকী রাস্তা পায়ে হেঁটে ফুটপাত অতিক্রম করি যদিও মিরপুর ১ রাইনখোলা, বক্সনগর এর চিড়িয়াখানার দিকের রাস্তার দুইপাশের অধিকাংশ ফুটপাতই বাড়ী নির্মান সামগ্রী এবং দোকানিদের দখলে!

জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের গেইট
জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের গেইট

সকাল ১১ টা ২৩ মিনিটে জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান তথা বোটানিকাল গার্ডেনর সামনে পোঁছাই। ২০ টাকার টিকেট কাটিয়ে ভিতরে ঢুকি, ঢুকতেই চোখে পড়ে ধূলিদূসরিত মৃতপ্রায় ঝাউ এর গাছ।

ধূলিদূসরিত মৃতপ্রায় ঝাউ গাছ
ধূলিদূসরিত মৃতপ্রায় ঝাউ গাছ

বাইরে প্রচুর ধূলোবালি, যার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে ফটক দিয়ে ঢুকতেই ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা এসব ঝাউ গাছের উপর। একটু সামনে এগিয়ে গেলেই মূল সড়ক

জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের প্রবেশপথ
জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের প্রবেশপথ

হাতের বাম পাশে মূরোল করা জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের মানচিত্র এবং একটু এগিয়ে গেলেই হাতের বাম-পাশে স্টিল ফ্রেমে লেখা জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান এর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি যাতে লেখা আছে:

১৯৬১ সনে প্রতিষ্ঠিত হয় জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান। ঢাকার কেন্দ্রস্থল হইতে ২০ কি: মি: দূরে অবস্থিত এই উদ্যান ২০৮ একর আয়তনে ৫৭টি সেকশন সম্বলিত। উদ্যানটি দেশী-বিদেশি বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ সংগ্রহ, সংরক্ষন ও জীবনপুল তৈরীর মুখ্য উদ্দেশ্য নিয়া গঠিত হয়। এখানে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও গবেষনার জন্য সহায়তা প্রদান এবং দর্শনার্থীদের জন্য প্রাকৃতিক শোভা উপভোগের বিষয়টি প্রাধান্য দেওয়া হয়। উদ্যানে ছোট-বড় ৭টে জলাশয়ের পাশে জলপ্রপাত ও ডেক আছে। বর্তমানে ১১৪ টি উদ্ভিদ পরিবার ভুক্ত ৯৫০টি প্রজাতির গাছ-পালা নিয়া জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান একটি জীবন্ত উদ্ভিদ সংগ্রহশালা। এখানে ২৫৫টি প্রজাতির ২৮,২০০ টি ব্রক্ষ, ৩১০ টি প্রজাতির ৮,৪০০ টি গুল্ম ও ৩৮৫ টি প্রজাতির ১০,৪০০টি বীরুৎ জাতীয় গাছ আছে। ইহা ছাড়াও ৬টি নেট হাউজে রহিয়াছে বিরল প্রজাতির অর্কিড ও ক্যাকটাস। উদ্যানে ২২ প্রজাতির বাঁশের ১টি বাঁশবাগান, গজারী বন, পাম বাগান, মেডিসিনাল বাগান, ফল বাগান,ধাঁধাঁ হেজ, সার্ধশত বর্ষের অধিক বয়সের বটবৃক্ষ প্রভৃতি দর্শনীয় বস্তু। শিক্ষা ও গবেষনা কাজে এবং সাধারন উদ্ভিদ প্রেমিকদের প্রায় ১৫ লক্ষ জন প্রতি বছর এই বাগান পরিদর্শন করিয়া থাকেন।

 

জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

একটু এগিয়ে গেলেই হাতের বাম পাশে গোলাপ বাগান

জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের গোলাপ বাগান
জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের গোলাপ বাগান

সোজা না গিয়ে ডানপাশের চিকন পার্শ রাস্তা দিয়ে পুকুরের পাশ দিয়ে হাঁটা ধরলাম।

জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের পুকুর
জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের পুকুর

বাকী পুকুরগুলোতে পানি না থাকলেও এই পুকুরে সবসময় পানি থাকে। বাকী পুকুরগুলো অধিকাংশই মেীসুমি পুকুর। পুকুরের চারপাশে বসার বিভিন্ন প্রকারের বন্দোবস্ত করা আছে যেমন বিশ্রাম ছাউনি, সিঁড়ি এবং পাকা টুল। পুকুরের মাঝখানে ছোট কৃত্তিম দ্বীপ তৈরী করা হয়েছে। যার সংযোগ সেতুটাও দেখতে ভারী সুন্দর।

জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের ঢুকতেই প্রথম পুকুরের মধ্যবর্তী দ্বীপের সংযোগ সেতু
জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের ঢুকতেই প্রথম পুকুরের মধ্যবর্তী দ্বীপের সংযোগ সেতু

দ্বীপের মাঝখানে বিভিন্ন প্রকার গাছ চারপাশে বৃত্তাকার সিড়ি দিয়ে বসবার জায়গা করা হয়েছে।

সিড়ি
সিড়ি

সিড়ির ইটের ফাকে ফাকে জন্মানে ফার্ন এরই ইঙ্গিত দেয়যে খুব একটা রক্ষনা বেক্ষন-করা হয়না।

সিড়ির ইটের ফাকে ফাকে জন্মানে ফার্ন
সিড়ির ইটের ফাকে ফাকে জন্মানে ফার্ন

দ্বীপ থেকে বের হয়ে পুকুরের পাশ ধরে সামনে এগিয়ে গিয়ে মূল সড়কে উঠলে হাতের বাম পাশে শাপলা পুকুর। যদিও এ সময় পুকুরে পানি কিংবা শাপলা কোনটাই নেই। ডানপাশে উদ্যান কর্মচারীদের কলোনি এখানে আরেকেটি গেট। এ গেট দিয়ে ভিতরে ঢুকতেই হাতের বাম পাশে রেস্ট হাউস। রাস্তার পাশে অশোক এবং নানাবিধ গাছের সারি, অশোক গাছে থোকায় থোকায় প্রচুর ফুল ফুটে আছে।

অশোক গাছ
অশোক গাছ

দুপুরের রোদে ছবিগুলো কিছুটা জলসানো একটু কাছ থেকে যদি দেখি অশোক ফুল দেখতে কিছুটা এমন

অশোক ফুল
অশোক ফুল

 

অশোক ফুল
অশোক ফুল

হাতের ডানপাশে স্টিল ফ্রেমের গাইড ম্যাপ

জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের গাইড ম্যাপ
জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের গাইড ম্যাপ

পাতাঝরা বৃক্ষের গায়ে নতুন পাতা আর পায়ের নিচে ঝরা শুকনো পাতার মর্মর সে এক আলাদা অনুভূতি।

গাছের ডালে নতুন গজানো সবুজ পাতা
পাতাঝরা গাছের ডালে নতুন গজানো সবুজ পাতা

তিতপাই গাছ এবং গাছের নিচে বিছিয়ে থাকা তিতপাই ফুল নাম তিত হলেও ফুলের গ্রাণ ভারী মিষ্টি

ফুলে-ফুলে ঢাকা তিতপাই গাছ
ফুলে-ফুলে ঢাকা তিতপাই গাছ
গাছের নিচে পড়ে থাকা তিতপাই ফুল
গাছের নিচে পড়ে থাকা তিতপাই ফুল

ছবির মত সুন্দর তাই ছবি দিয়েই প্রকাশের ব্যার্থ প্রচেষ্টা। সুন্দরকে আমরা ক্যামেরার ফ্রেমে বন্দি করে রাখতে চাই কিন্তু এর দরুন ভ্রমনের মূল মজাটাই নষ্ট হয়ে যায়, তাই যত কম ছবি তোলা যায় তারই চেষ্টা করলাম। জাতীয় উদ্যানের ওয়াচ-টাওয়ারগুলোর সবগুলোতে তালা ঝুলছে। ওয়াচটাওয়ার থেকে সুন্দর্য উপভোগ এবারের মত অভিলাসই রয়ে গেল।

বাগান বিলাস পুষ্পদ্বার
বাগান বিলাস পুষ্পদ্বার
নাম না জানা ফুল
নাম না জানা ফুল
পাহাড়ী পথ সদৃশ পথ
পাহাড়ী পথ সদৃশ পথ
মাথার উপরের সবুজ
মাথার উপরের সবুজ
দেবদারু সড়ক
দেবদারু সড়ক
ঝাউ সড়ক
ঝাউ সড়ক

উঁচু-নিচু আঁকা-বাঁকা পথ, ঝিঝি পোকার শব্দ, পদ্মপুকুরের পদ্ম, যুগলের হাতে-হাত বা কোলে মাথা রেখে গল্প করার দৃশ্য কিংবা গভীরতা বাড়াতে পুকুর থেকে কেটে ওঠানো কাদামাটির উপর হেঁটে আসা মুহুর্তগুলো ভারি দারুন ছিল। যদিও কাদায় হাঁটতে গিয়ে স্নিকারের বেহাল দশা। এই সুখানুভূতির সাথে কিছু অপ্রিতিকর সত্য উদ্যানে যেমন টহল দেওয়া টুরিষ্ট পুলিশ কিংবা অলস বসে থাকা ভ্যান ভর্তি র‍্যাাব সদস্য আছে ঠিক তেমনি আছে দালালের দেীরাত্ম। উদ্যানের একটা অংশতো যাওয়াই যায়না, সামনে এগুতেই হাতে লাঠি নিয়ে বসে থাকা কিছু মাস্তান টাইপের ছেলেদের সতর্কবানী “এদিকে কিছু নেই, ওইদিকে চলে যান;” এ বিষয়গুলো শুধুযে আমার চোখে পড়ছে ঠিক তা কিন্তু নয় বরং আমার মতো অনেকেই নিরুপায় হয়ে সরে আসছে। আমাদের প্রশাসন এদিকে চোখ কেন দেয় না তা জানি নাহ! ইত:পূর্বেও এসকল বিষয় নিয়ে অনেক প্রতিবেদন হয়েছে কিন্তু কবি নিরব।

অন্যকোনদিন অন্য কোথাও ভবগুরে হয়ে পদব্রজে বা যানবাহনে গুরে এসে লিখবো সেই প্রত্যাশায় টা-টা 🙂 ।

Comments

  1. হাবিবুর রহমান

    অনেক আগে গিয়েছিলাম। এখনো যেতে মনে চায়, কিন্তু সময় মিলিয়ে যাওয়া হয়না। তবে এই পোস্ট পরার পরে এখন আর দেরি সহ্য হচ্ছে না। ধন্যবাদ এরকম পোস্ট করার জন্য।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।